Arrogant Boss (Jeon Jungkook x Kim Taehyung) অহংকারী বস – প্রথম পর্ব (জিওন জাংকুক × কিম তাইহিউং)

8/6/2026

Arrogant Boss (Jeon Jungkook x Kim Taehyung) অহংকারী বস – প্রথম পর্ব (জিওন জাংকুক × কিম তাইহিউং)

গাজী স্নিগ্ধা হোসেইন মনা

GBN NEWS


প্রথম অধ্যায়
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে সিউলের বুকে। নিয়ন আলোর শহরটা আজ যেন অতিরিক্ত ধূসর আর বিষণ্ণ। আকাশের বুক চিরে নামা তীব্র বৃষ্টির ধারা পিচঢালা কালো রাস্তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
"এমন চেহারার একটা মেয়ের সাথে ফুর্তি করার জন্য কোনো কাস্টমার টাকা খরচ করবে বলে তোমার মনে হয়, মিস কিম তেহিউং? আমার তো চরম সন্দেহ আছে, সিউলের কোনো সাধারণ ছেলেও তোমার দিকে ফিরে তাকাবে কি না!"
গাঢ় অন্ধকার, জনশূন্য গ্যাংনামের একটা গলিতে কথাটা শুনামাত্রই আঁতকে উঠল তেহিউং। বৃষ্টির একটানা শব্দের মাঝেও গলার চেনা জেদি আর উপহাস মেশানো আওয়াজটা পরিষ্কার শুনতে পেল সে। আওয়াজটা কানে আসতেই তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। নিজের প্রাক্তন অফিস বস— জেওন কর্পোরেশনের সর্বেসর্বা জিওন জংকুক-কে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু এই দুর্যোগপূর্ণ রাতে চারদিকের শুনশান নীরবতা আর মেঘের গর্জনে সেই ভয়টা যেন আরও বিষাক্ত হয়ে বুকে চেপে বসল।



তেহিউং বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাওয়া নিজের জ্যাকেটটা শরীরের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলগুলো সরিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
—"আপনি... আপনি এখানেও? স্যার, আপনি আমার সাথে এমন কেন করছেন? আমাকে আমার মতো থাকতে দিন, প্লিজ!"
তেহিউংয়ের ভেজা গলার আর্তনাদ শুনে জংকুক তার দামী ব্ল্যাক ল্যাম্বরগিনি গাড়িটার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থা থেকে মুখ তুলল। সে ছাতা নেওয়ার কোনো প্রয়োজন মনে করেনি; বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার সিল্কি কালো চুলে আর দামী স্যুটে আছড়ে পড়ছে। ফোনের স্ক্রিনের আলোয় তার তীক্ষ্ণ চোয়াল আর অন্ধকার চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। সিউলের এই অহংকারী বিলিয়নেয়ারদের এই এক সমস্যা— নিজেদের ক্ষমতা আর রূপ নিয়ে তারা এতটাই অন্ধ থাকে যে অন্য কারও মতামতকে স্রেফ আবর্জনা মনে করে। তেহিউং যে জেওন কর্পোরেশনের পিএ (PA) চাকরিটা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছে, সেটা জংকুকের মতো অহংকারী মানুষ সহজে মেনে নিতে পারেনি।



জংকুক পকেটে হাত গুঁজে বৃষ্টির শব্দের ওপর দিয়ে শীতল গলায় বলল,
—"এই রাস্তাটা কি তোমার বাবার নামে রেজিস্ট্রি করা, মিস কিম? যে এখানে আমি দাঁড়াতে পারব না?"
—"স্যার, আমরা কেউ কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চা নই যে এভাবে ঝমঝম বৃষ্টির মাঝে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করব! আমি জেনে-বুঝে, নিজের ইচ্ছায় চাকরিটা ছেড়েছি।" তেহিউং নিজের ভেতরের ক্ষোভ আর কান্না লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল।
—"তা কী বুঝে চাকরিটা ছাড়লেন আপনি?" জংকুক বৃষ্টির মাঝেই একধাপ এগিয়ে এল। তার দীর্ঘ, চওড়া অবয়ব তেহিউংয়ের ওপর এক অন্ধকার ছায়া ফেলল। "কী যেন বলেছিলেন সেদিন ডিরেক্টরদের সামনে? দরকার হলে সেজেগুজে সিউলের কোনো সস্তা নোংরা হোটেলে যাবেন, তবুও আমার আন্ডারে চাকরি করবেন না, তাই তো? তো বলুন... এক রাতের ফি কত আপনার? প্রথম কাস্টমার না হয় আপনার এই প্রাক্তন বসই হোক!
এই বৃষ্টির রাতে ব্যাপারটা মন্দ হবে না।



তেহিউং অপমান আর রাগে কেঁদে উঠে চেঁচিয়ে উঠল,
—"আপনার লজ্জা বলতে কিছু নেই?! আমাকে এভাবে রাস্তায় আটকে কেন বিরক্ত করছেন?"
জংকুকের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বৃষ্টির বেগ বাড়ার সাথে সাথে তার ভেতরের রাগটাও যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে নিমেষেই এগিয়ে এসে তেহিউংয়ের নরম, ভেজা চোয়ালটা নিজের শক্ত হাত দিয়ে চেপে ধরল। তার চোখের মণি দুটো রাগে কুচকুচে অন্ধকার হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত কামড়ে জংকুক বলল,
—"আমি চাইলে তোমার মতো হাজারটা মেয়েকে নিজের বেডরুমে সাজিয়ে রাখতে পারি, বুঝেছ? জেওন জংকুক কী জিনিস, তোমার কোনো ধারণা নেই!"
চোয়ালের তীব্র ব্যথায় তেহিউংয়ের চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল, যা বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। তবুও সে জংকুকের চোখ থেকে চোখ নামাল না।


—"আমি অস্বীকার করছি না, আপনার টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে আপনি সব পারেন। তবুও আমার পিছনে কেন পড়ে আছেন? আমার জীবনটা কেন ধ্বংস করে দিচ্ছেন?"
—"কী ভেবেছ তুমি? আমি তোমার প্রেমে পাগল হয়ে গেছি?" জংকুক ঠোঁট বাঁকিয়ে এক পাশবিক হাসল, যা বৃষ্টির রাতে আরও ভয়ংকর শোনাল। "নিজেকে কী ভাবো তুমি? তোমার সাথে সংসার করার জন্য আমি তোমাকে চাচ্ছি না। আমি শুধু সবাইকে দেখাতে চাই— জংকুক যা চায়, তা যেকোনো মূল্যে ছিনিয়ে নেয়। তোমায় তো আমি বিয়ে করবই, চাকরি ছেড়ে তুমি যাবে কোথায়?"
—"স্যার! আপনি নিজের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছেন! এভাবে আমার গায়ে হাত দিচ্ছেন!"
—"তুমি এখন আর আমার এমপ্লয়ি নও, সো তোমাকে রেস্পেক্ট করার কোনো প্রয়োজন মনে করছি না। চাকরিটা ছেড়ে কী মস্ত বড় ভুল করেছ, সেটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাবে। জংকুকের আসল রূপটা দেখার শখ ছিল না তোমার?"

জংকুক তেহিউংয়ের কোনো মিনতির তোয়াক্কা না করে তাকে জোর করে টেনে নিয়ে নিজের ল্যাম্বরগিনির ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে দিল এবং লক করে দিল। গাড়ির ওয়াইপারটা একটানা উইন্ডশিল্ডের পানি পরিষ্কার করে চলেছে। গাড়ি চলতে শুরু করল সিউলের আলোঝলমলে, বৃষ্টিভেজা হাইওয়ে ধরে।
তেহিউং সিটে জড়সড় হয়ে বসে রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে ফুঁসছিল। গাড়ির হিটার চালু থাকায় তার ভেজা শরীরটা কাঁপছিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, জানালার বাইরে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
—"এত কিছু করেও শান্তি হয়নি আপনার? পুরো পরিবারটাকে শহর থেকে উচ্ছেদ করলেন, আমার ভাই সু-বিনকে মিথ্যে চুরির অপবাদে জেলে পাঠালেন! সারাদিন আমাদের পুরো পরিবারের মুখে একটা দানা পর্যন্ত পড়তে দেননি! আর কী চান আপনি আমার কাছে?"


জংকুক নির্বিকারভাবে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
—"আমি তো এসবের কিছুই চাইনি, মিস কিম তেহিউং।আমি শুধু আপনাকে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি নিজে জেদ ধরে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। এখনও সময় আছে, আমার দেওয়া বিয়ের প্রপোজালে হ্যাঁ বলে দাও তাহলে সব আগের মত হয়ে যাবে।"
—"আমি এর আগেও অনেকবার আপনাকে বলেছি, আমি আপনাকে কোনোদিন..."
—"তুমি কী বলেছ, আমার স্পষ্ট মনে আছে।" জংকুক হঠাৎ সজোরে ব্রেক চেপে গাড়িটা রাস্তার একপাশে থামাল। বাইরে তখন মেঘের তীব্র গর্জন। সে সিট থেকে তেহিউংয়ের দিকে প্রায় ঝুঁকে এসে বলল, "তুমি দরকার হলে হোটেলে যাবে, তাও আমায় বিয়ে করবে না। যদিও তুমি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়, কিন্তু সারাদিন ধরে কেঁদে কেটে নিজের মুখের যে অবস্থা করেছ— কোনো ছেলেই তোমাকে নিয়ে হোটেলে যেতে রাজি হবে বলে মনে হচ্ছে না।"
তেহিউংয়ের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। জংকুক তার কান্নারত মুখের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল,
—"আহা, কাঁদবে না প্লিজ। আমি আবার মেয়েদের চোখের জল সহ্য করতে পারি না। চলো, তোমাকে একটু ফ্রেশ করে দেই, তাহলে সব ছেলেই পছন্দ করবে।"
বলেই জংকুক তেহিউংয়ের হাতটা শক্ত করে ধরল।
—"হাত ছাড়ুন বলছি! আপনি আমার সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না! আমি কিন্তু চিৎকার করব!"

—"চিৎকার করো... প্লিজ করো। আমি কি বারণ করেছি? এই বৃষ্টির শব্দে তোমার চিৎকার বাইরে পৌঁছাবে তো?" জংকুক উপহাসের সুরে বলল।
—"আমি ফাজলামো করছি না! আমি সত্যিই চেঁচাব! এলাকার মানুষ এসে আপনাকে..."
—"হা হা হা!" জংকুক উচ্চস্বরে হেসে উঠল, যা এই নিস্তব্ধ গাড়ির ভেতর ভয়ার্ত শোনাল। বাইরে তখন বিজলি চমকাচ্ছে। "তুমি হয়তো জানো না, জেওন জংকুক কে? জংকুকের প্রথম পরিচয় সে ইতেওনের আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেনা নাম। স্যুট-টাই পরে দুদিন কর্পোরেট অফিসে গিয়ে আমি ভদ্রলোক হয়ে যাইনি। অফিসে আমার যে আচরণ দেখেছ, সেটা স্রেফ একটা মুখোশ ছিল। সিউলের পুলিশ থেকে শুরু করে গ্যাংস্টাররা পর্যন্ত আমাকে সমীহ করে চলে। সো, তুমি যতই চিৎকার করো, তোমার জন্য কেউ এগিয়ে আসবে না।"
জংকুক তেহিউংয়ের ভেজা গালের একপাশ আলতো ছুঁয়ে বলল, "আর আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করছি না। জাস্ট তোমাকে হেল্প করতে চাচ্ছি। তাছাড়া, আমি তোমার প্রথম কাস্টমার হলে সমস্যা কোথায়?"
—"আপনার একটুও লজ্জা করে না একটা মেয়েকে এভাবে বলতে?" তেহিউংয়ের গলা বুজে এল।

—"কোনো মেয়ে যখন নিজের ইগো দেখাতে গিয়ে নিজেকে সস্তা করতে পারে, তখন আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই।"
গাড়ি এসে থামল হাঙ্গাং নদীর পাড়ে জংকুকের একটা ব্যক্তিগত বিলাসবহুল পেন্টহাউসের সামনে। বাইরে নদীর পানি আর বৃষ্টির শব্দ মিলে এক অদ্ভুত গর্জন তৈরি করেছে। জংকুক তেহিউংয়ের হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে লিফট দিয়ে একেবারে ভেতরে নিয়ে গেল এবং লিভিং রুমের দরজাটা লক করে দিল।
তেহিউং ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরের কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। তার গা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে দামী কার্পেটের ওপর।
hhhhhh

—"স... স্যার, প্লিজ আমার সাথে এমন কিছু করবেন না..."
জংকুক তার ভেজা কোটটা খুলে সোফায় ছুঁড়ে ফেলে অবাক হয়ে তাকাল। তারপর ডার্ক একটা হাসি দিয়ে বলল, "কী করছি আমি? যে মেয়ে হোটেলে গিয়ে ব্যবসা করার হুমকি দেয়, সে সামান্য একটা রুমের দরজা বন্ধ হওয়া দেখে ভয় পাচ্ছে?"
—"আমি... আমি ওটা রাগের মাথায় বলেছিলাম।" তেহিউং মাথা নিচু করে বলল।
—"কার সাথে কী কথা বলা যায় আর কি বলা যায় না, সেটা তোমার বোঝা উচিত ছিল, তেহিউং। তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছো, এমন সস্তা কথা তোমার মুখে মানায় না।"
—"ভুল হয়ে গেছে... মাফ করে দিন। আর কখনো এমন কিছু বলব না। প্লিজ আমাকে যেতে দিন, বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে।"
 vvvvvvvvvv
জংকুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ভেজা টাইটা ঢিলে করল। "আমি বদমেজাজি হতে পারি, কিন্তু দুশ্চরিত্র নই। ওদিকে ওয়াশরুম আছে, যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। গরম পানির গিজার অন করা আছে।"


তেহিউং কিছুটা অবাক হয়ে জংকুকের দিকে তাকাল। জংকুক তাকে ধমক দিয়ে বলল, "কী হলো? যাচ্ছ না কেন?"
তেহিউং আর কথা না বাড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লক করে দিল এবং বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের ভেজা, ফ্যাকাশে রূপটা দেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। বাইরে জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটানা আঘাত করে চলেছে।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও তেহিউং বের হচ্ছে না দেখে জংকুক দরজায় নক করল। শ্লেষাত্মক গলায় বলল, "ম্যাডাম, রাত ১০টা বাজে। রাতটা কি আমার সাথেই কাটানোর ইচ্ছে? এই বৃষ্টির রাতে তোমার কাকা-কাকির কাছে ফিরবে না? আমার অবশ্য কোনো আপত্তি নেই। যদি থাকতে চাও, তবে ভেতরে আরও কিছুক্ষণ থাকো, পরে দরজা ভেঙে বের করব। আর যদি যেতে চাও, জলদি বের হও।"


তেহিউং কোনোমতেই এই ড্রাগনের খাঁচায় রাত কাটাতে চায় না। সে চট করে দরজা খুলে দিল। জংকুক তেহিউংয়ের লাল হয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে রেগে গিয়ে বলল, "চোখ-মুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হতে পাঠিয়েছিলাম, কান্না করতে নয়! যতসব ফালতু... সরো এখান থেকে!"
জংকুক নিজেই ওয়াশরুমে ঢুকে একটা মগ ভর্তি পানি নিয়ে এসে তেহিউংয়ের সামনে দাঁড়াল। "চোখ-মুখে পানি দাও। আমার সামনেই দাও।"
তেহিউং অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জংকুক চোখ রাঙিয়ে বলল, "দেবে না? আচ্ছা, তাহলে শাওয়ারটা অন করি? পুরো ভিজে ভূত হতে পারবে।"
বাধ্য হয়ে তেহিউং চোখে-মুখে পানি দিল। জংকুক তার হাতে একটা শুকনো, নরম তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে বলল, "রুমে গিয়ে বিছানায় বসো।"
তেহিউং বিছানায় গিয়ে চুপচাপ বসে রইল, বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। কিছুক্ষণ পর জংকুক বাইরে থেকে সিউলের একটা নামী রেস্তোরাঁর গরম খাবারের পার্সেল নিয়ে ঘরে ঢুকল। স্যুপের গরম ধোঁয়া আর খাবারের সুগন্ধ ঘরটায় ছড়িয়ে পড়ল। জংকুকের এই অদ্ভুত পরিবর্তন তেহিউং-কে ক্রমশ অবাক করছিল।
—"নাও, খেয়ে নাও। সারাদিন তো কিছু খাওনি। খাওয়া শেষ করো, তারপর কিছু কথা বলব। তারপর তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।" জংকুক খাবারগুলো টেবিল গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল।
—"আমার খেতে ইচ্ছে করছে না, স্যার। আপনি যা বলার এখনই বলুন।"
—"না খেলে একটা কথাও বলব না।" জংকুকের সোজাসাপ্টা উত্তর।
তেহিউংয়ের ভেতরে চেপে রাখা রাগটা আবার দপ করে জ্বলে উঠল। "আমার পরিবারের কেউ এই বৃষ্টির দিনে সারাদিন কিছু খায়নি, স্যার! আপনি কি বুঝতে পারছেন না যে এই মুহূর্তে আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে কি না?!"
জংকুক থমকে গেল। বাইরে তখন এক ঝলক বিজলি চমকে উঠল। জংকুক কিছুটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফোনটা বের করল। "ওহ, তাই তো... আচ্ছা।" জংকুক একটা নাম্বারে ডায়াল করে হাঙ্গাং নদীর ওপারের সেই কটেজের ঠিকানা আর রুম নাম্বার দিয়ে বলল, "সেখানে এখনই ভালো মানের ডিনার পাঠিয়ে দাও। হ্যাঁ, গরম স্যুপ আর রাইস। আর যদি কেউ জিজ্ঞেস করে কে পাঠিয়েছে, বলবে কিম তেহিউং পাঠিয়েছে।"
ফোনটা রেখে জংকুক তেহিউংয়ের দিকে তাকাল। "এবার তো শান্তি? খাও এবার।"
তেহিউং নিঃশব্দে খেতে শুরু করল, আর জংকুক কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কাঁচের ওপারে বৃষ্টির ধারা আর সিউলের আবছা আলো দেখছিল সে।
খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর জংকুক তেহিউংয়ের মুখোমুখি এসে বসল। তার চোখ দুটো এখন শান্ত, কিন্তু গভীর।
—"এবার বলো তো, কী সমস্যা তোমার? বিয়েটা কেন করতে চাও না আমাকে?"
তেহিউং চোখ নামিয়ে বলল, "আমি সেটা বলতে পারব না।"
—"কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে? থাকলে সরাসরি বলো। আমি জোর করে কারো মন পাওয়ার চেষ্টা করব না।"
—"না... তেমন কেউ নেই। আসলে... আমি আপনাকে পছন্দ করি না।" তেহিউং সত্যটাই বলে দিল।
কথাটা শোনামাত্রই জংকুকের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে উঠল। সে চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "গুড! তাহলে তো বিয়েটা আমাকেই করতে হচ্ছে তোমার। তা না হলে কালকের দিনটা তোমার জন্য আরও ভয়ানক হবে। আজ যা হয়েছে, তার চেয়েও বেশি।"
তেহিউং ভয় পেয়ে গেল। "কী করবেন আপনি?"
—"তোমার কাকাতো বোন জিমিন ... কাল তার ইউনিভার্সিটিতে এমন কিছু ঘটবে, যার পর সে বা তোমার পরিবার কেউ সমাজে আর মুখ দেখাতে পারবে না।" জংকুকের গলায় ঠান্ডা, নির্মম হুমকি।
—"না! দয়া করে জিমিনের কোনো ক্ষতি করবেন না!" তেহিউং জংকুকের হাত চেপে ধরল।
—"তাহলে বিয়েতে রাজি হও..."
তেহিউংয়ের আর কোনো উপায় পেল না । বাইরের ঝড়ের মতো তার মনের ভেতরেও তখন ঝড় চলছে। সে ভেঙে পড়ে বলল, "রাজি না হয়েই বা যাব কোথায়? আমার জেদের জন্য আংকেল আন্টির জীবনে এত বড় বিপর্যয় এসেছে, আমি আর নিতে পারছি না।"


জংকুকের ঠোঁটে এক বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। "এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। এবার বলো, এই বিয়ের বিনিময়ে জেওন জংকুকের কাছে তোমার কী কী ডিমান্ড আছে?"
—"আমার কোনো ডিমান্ড নেই। শুধু আমার পরিবারকে শান্তিতে থাকতে দিন।"
জংকুক তখনই পুলিশ স্টেশনে ফোন করে গ্যাংনামের চিফকে অর্ডার দিল, "কিম সু-বিনকে এখনই সব চার্জ থেকে মুক্ত করে ছেড়ে দেওয়া হোক। হ্যাঁ, রাতেই রিলিজ করো।"
ফোন রেখে জংকুক পকেট থেকে একটা চকচকে চাবি বের করে তেহিউংয়ের সামনে টেবিলের ওপর রাখল। সঙ্গে একটা ঠিকানা। "কাল থেকে তোমরা হান নদীর পাড়ের এই ফ্ল্যাটটায় থাকবে। এটা সেই অ্যাপার্টমেন্টের চাবি।"

তেহিউং চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ভাই মুক্ত হয়েছে, এটাই তার জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
রাত তখন প্রায় ১২টা। বাইরে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু একটানা রিমঝিম শব্দ হয়েই চলেছে। জংকুক তার গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে বলল, "চলো, তোমাকে ড্রপ করে দিয়ে আসি।"


—"আমি একাই যেতে পারব, স্যার। আপনার কষ্ট করতে হবে না।"
জংকুক বিরক্ত হয়ে কপালে হাত দিল। "এই জন্যই মেয়েদের আমি একদম সহ্য করতে পারি না। তোমার কথায় আমি চলব নাকি, ফাজিল মেয়ে? চলো বলছি!"
তেহিউং উঠে দাঁড়াতেই জংকুক তার পকেট থেকে একটা সোনার চেইন বের করে তেহিউংয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।
চেইনটা দেখামাত্রই তেহিউংয়ের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে বলল, "এটা... এটা তো আমার মায়ের চেইন! এটা তো আমি আজ দুপুরেই সিউলের একটা জুয়েলারি শপে বিক্রি করে দিয়েছিলাম সু-বিনের বেইলের টাকার জন্য! আপনি... আপনি এটা কোথায় পেলেন?!"
জংকুক কোনো উত্তর না দিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিল এবং ছাতাটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
(চলবে...)

Post a Comment

If you have any doubts, So Please let me know.

Previous Post Next Post